একাধিক অভিঘাতে বৈশ্বিক কনটেইনার শিপিং শিল্পে দোলাচল

বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের একটি প্রতিনিধিত্বকারী খাত হিসেবে বিবেচিত কনটেইনার শিপিং শিল্প।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের একটি প্রতিনিধিত্বকারী খাত হিসেবে বিবেচিত কনটেইনার শিপিং শিল্প। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও খাতটিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে একগুচ্ছ কারণ। যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির শুল্কনীতি, বন্দরজট, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগর বন্ধের হুমকি। এর সঙ্গে কভিড মহামারীর প্রভাবে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি ব্যাঘাত তো রয়েছেই। খবর এফটি।

সামুদ্রিক বাণিজ্য বিষয়ে পরামর্শক সংস্থা ড্রিউরির কনটেইনার রিসার্চ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক সায়মন হিনির মতে, সরবরাহ চেইন একঘেয়ে ও পূর্বাভাসযোগ্য হওয়াই ভালো। কিন্তু একাধিক কারণে এখন খাতটিতে স্বল্পমেয়াদে ব্যাঘাত ঘটছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্থগিত করা উচ্চ শুল্কের সময়সীমা শেষ হতে চলেছে ৯ জুলাই। কিন্তু কনটেইনার শিপিং শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের খুব কমই বিশ্বাস করেন, এটি চূড়ান্ত সময় হবে। অর্থাৎ কৌশলগত শুল্ক অনিশ্চয়তা বজায় রেখে দরকষাকষির সুবিধা নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

একজন শীর্ষস্থানীয় কনটেইনার শিপিং নির্বাহী বলেন, ‘এ অনিশ্চয়তা গ্রাহকদের জন্য জটিলতা তৈরি করছে। তারা এখন যতটা সম্ভব পণ্যের ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। কারণ বছরের বাকি সময় কী ঘটবে জানেন না। এতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি জটিলতা যুক্ত হচ্ছে।’

এ অনিশ্চয়তার আঁচ পড়েছে পরিবহন খরচ ও শেয়ারবাজারে। চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের ওঠানামার মাঝে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ডেনমার্কের এপি মোলার-মায়েরস্ক এবং জার্মানির হাপাগ-লয়েডের মতো কনটেইনার কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ব্যাপক ওঠানামা করেছে।

কনটেইনার শিপিং খাত কি বেশি মাত্রায় অপ্রত্যাশিত ঘটনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে কোম্পানিগুলো পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, বাজার স্বাভাবিক হয়ে এলে ওইসব পদক্ষেপ নতুন কোনো সমস্যা তৈরি করবে কিনা? পাশাপাশি বিশ্বায়নের নতুন মেরুকরণ ব্যবসায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

কভিড মহামারীর প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর বৈশ্বিক কনটেইনার শিপিং শিল্প ফুলেফেঁপে ওঠে। যার প্রভাব পড়ে মুনাফার অংকে। ড্রিউরির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২২ সাল পর্যন্ত শিল্পটি গত ৬০ বছরের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে। নতুন জাহাজ কিনতে ওই মুনাফার বড় অংশ ব্যয় হয়েছে। এতে এগিয়ে রয়েছে শীর্ষস্থানে উঠে আসা মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)।

কভিড-পরবর্তী মুনাফা দিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলো এত জাহাজের ক্রয়াদেশ দিয়েছে, যা বর্তমান সক্রিয় জাহাজ বহরের ৩০ শতাংশ। জাহাজের অতিরিক্ত এ সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু গত কয়েক বছরে একাধিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা যুদ্ধ, বন্দরজট মিলিয়ে নতুন জাহাজের জন্য এখনো বিপর্যয়কর কিছু ঘটেনি। অনেকেই সতর্ক করে বলছেন, কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে পুরনো জাহাজ বহর থেকে সরিয়ে না নিলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হবে।

সায়মন হিনি বলেন, ‘জাহাজের নতুন অর্ডার পুরো শিল্পের জন্য বড় একটি ঝুঁকি। এ শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা মনে করছে, সবসময়ই কোনো না কোনো ব্যাঘাত থাকবে। কিন্তু বাজার স্বাভাবিক হয়ে এলে তারা মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। তখন তাদের হাতে চাহিদার তুলনায় বড় আকারে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন ব্যাঘাত ঘটবে এমন আশঙ্কা করছেন কনটেইনার শিল্পের একটি অংশ। প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২১) চীনকে ঘিরে বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি দেন তিনি। তখন অনেক কোম্পানি উৎপাদন কেন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। যেমন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন কঠোর শুল্কনীতির কারণে এ উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইউরোপের বৃহৎ এক উৎপাদনকারী বলেন, ‘এখন সরবরাহ-সম্পর্কিত বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন।’

সায়মন হিনির মতে, শুল্কনীতি নিয়ে এক ধরনের অবসাদ কাজ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সিদ্ধান্তের স্থায়িত্ব নেই। তিনি শুল্ক ঘোষণা করে পরে স্থগিত করেন। পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বিরতির পর আরেক বিরতির মধ্যে আটকে রাখা হচ্ছে।

এত অনিশ্চয়তার মাঝেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বায়নবিরোধী অবস্থানের প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষিত বোধ করছেন শিপিং খাতের প্রধানরা। কারণ বছরের পর বছর সরবরাহ চেইন এতটাই টেকসই গড়ে উঠেছে যে সহজে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। মায়েরস্কের প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট ক্লার্ক গত মাসে বলেছিলেন, ‘ট্রাম্প যদি বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ নতুন করে গড়তেও চান, তাহলে তা করতে তার এক বা দুই দশক টানা চেষ্টা করতে হবে।’

অনেকে বিশ্বাস করেন, চীন ও ভারত নতুন এক বিশ্বায়নের যুগের নেতৃত্ব দিতে পারে। এক শিপিং নির্বাহী বলেন, ‘আমরা একদিকে বিশ্বায়ন ১.০-এর ঝুঁকি কমাচ্ছি, আরেকদিকে বিশ্বায়ন ২.০-এর দিকে এগোচ্ছি।’

এত সংকট ও শিপিং কোম্পানিগুলোর বেশি মুনাফা নিয়ে সমালোচনা সত্ত্বেও খাতজুড়ে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ রয়েছে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’র পর হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় চীন-যুক্তরাষ্ট্র রুটে কোম্পানিগুলো জাহাজ সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। ফলে পরিবহনমূল্য রেকর্ড গতিতে কমছে। তা সত্ত্বেও অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনায় কনটেইনার শিপিং খাতে চলমান দোলাচল শিগগির নাও থামতে পারে।

আরও